চোখ

অস্ত্র উদ্ধার অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব পড়ল কমান্ডার মুস্তাফিজের কাঁধে। চৌকস অফিসার বলতে যা বোঝায়, সে তা-ই। এগারোটা মার্ডার কেসের আসামি কে নিয়ে নিশুতি রাতে হবে অভিযান, যখন আসামীর সব সহযোগী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকবে, তখন, ঐ মোক্ষম সময়ে, তাদের আস্তানায় চালানো হবে অভিযান। এগারোটা মার্ডার কেসের আসামী যে দলে, সে দলের অস্ত্রসস্ত্র কম হবার কথা নয়।
সন্ধ্যায় আসামীর কাছে গেলেন মুস্তাফিজ, বললেন, “তোকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে যাব। কী খেতে চাস বল। ভালো মন্দ খেলে তোর মাথা খুলবে, ঠিকঠাক বলতে পারবি কোথায় অস্ত্র লুকানো আছে।” এগারোটা মার্ডার কেসের আসামীর খুব একটা ভাবান্তর দেখা গেল না। খুব আহামরি কিছু খেতে চাইলো না সে। গরম ভাত, আলু ভর্তা, শুকনা মরিচ ভাজা, মশুরি ডাল চচ্চরি, আর মিষ্টি দই, আর শেষে জর্দা, শুকনা সুপারি, ও চুন দিয়ে খিলি পান। 
রাত দশটার দিকে মুস্তাফিজ আবারো গেলেন আসামীর কাছে, বললেন, “চল, তোর পরিবারের সাথে দেখা করাই। পরিবারের মানুষদের মুখ দেখলে তোর মন নরম হবে, তুই বুঝবি অস্ত্র কত খারাপ। তখন তুই ঠিকঠিক বলতে পারবি অস্ত্র কই আছে।” 
এগারো মার্ডার কেসের আসামীর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কমান্ডার মুস্তাফিজ নাখোশ হলেন, ভাবলেন, ‘মাদার**র টাকা কই!  চাঁদাবাজি, ছিনতাই, খুন করে পাওয়া টাকা করেছেটা কী! বাঞ্চোত এতগুলো মার্ডার করছে, আর থাকে এই নর্দমায়!’ কমান্ডার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে দেখে; দোচালা টিনের ঘরের নিচতলায় আসামীর দুই কামরার ঘর। দরজা খুলল আসামীর বউ; বউয়ের কোলে বাচ্চা, পৌনে দুই বছরের বাচ্চা। বাচ্চা একটা পাতলা টেট্রন কাপড়ের কুঁচকানো  হাফ প্যান্ট পরা, গা খালি। তাকে ঘুম পাড়ানোর চেষ্টা চলছিল বোঝা যায়। আসামী ঘরে ঢুকলো, বউয়ের দিকে তাকালো, হাত বাড়ালো, বউ বাচ্চাটাকে আসামীর কোলে দিল। বাচ্চা আধো ঘুমে আসামীকে দেখলো, “আব বা” বলে ডাকলো, আসামীর গলা পেঁচিয়ে ধরে কাঁধে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে ফেলল। আসামীর বউ ফুঁপিয়ে কান্না শুরু করেছে কখন- কেউ খেয়াল করেনি; কিংবা খেয়াল করলেও সেটা স্বাভাবিক ঘটনা জ্ঞানে কেউ আমলে নিল না। হ্যান্ডকাফ পড়া হাতে আসামী বাচ্চাটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। বউয়ের সাথে আসামীর কোন কথা হলো না, ঘরে মা ছিল, মা কে দেখা যাচ্ছে না, মা কোথায়- এটাও সে জিজ্ঞেস করলো না; কেবল বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে ঘরের ভেতর দাঁড়িয়ে রইল। 
দশ মিনিটের বেশি হয়ে গিয়েছিল, কমান্ডার মুস্তাফিজ আসামীকে  তাড়া দিল, “এই, চল, রাত বেড়ে যাচ্ছে! পরে তোর সাঙপাঙদের নাগাল পাবো না। চল চল।” 
কমান্ডারের কথায় আসামীর কোন ভাবান্তর দেখা গেল না। দেখে মনে হলো সে যেন কমান্ডারের কথা শুনতেই পায়নি। বাচ্চা কোলে সে যেমন দাঁড়িয়ে ছিল, তেমনি দাঁড়িয়ে রইলো। কমান্ডার মুস্তাফিজ খানিকক্ষণ অপেক্ষা করলো। সারা সন্ধ্যা আসামী খুব শান্ত, খুব বিনয়ী আচরণ করেছে, যখন যা বলা হয়েছে, সাড়া দিয়েছে; এই প্রথম সে কমান্ডারের কথা অমান্য করলো। আসামীর কোন ভাবান্তর নেই দেখে আবারো তাড়া দিলো, এই চল!”
এবারও আসামীর মাঝে কোন বিকার নেই। সে তার বাচ্চা কোলে দাঁড়িয়ে থাকলো। কমান্ডার মুস্তাফিজের মাথায় রক্ত চড়ে গেলো। “বাঞ্চোত কথা কানে যায় না!” বলে বাচ্চাটাকে একটানে আসামীর কাছ থেকে নিয়ে তার বউয়ের কোলে চাপিয়ে দিলো সে। বাচ্চাকে কোল থেকে কেড়ে নিতেই আসামী ঝট করে কমান্ডার মুস্তাফিজের দিকে তাকালো। কোন কথা বলল না। তাকিয়ে থাকলো। আসামী কমান্ডার মুস্তাফিজের চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকল। কয়েক সেকেন্ড। মাত্র কয়েক সেকেন্ড।
কমান্ডার মুস্তাফিজ কোল থেকে সন্তান ছিনিয়ে নেয়া এগারটা মার্ডার কেসের আসামী বাপের চোখ দেখলো। সে চোখে, সে দৃষ্টিতে একটা  কিছু ছিলো। একটা কিছু, যা কমান্ডার মুস্তাফিজ ধরতে পেরেও পারলো না। একটা কিছু যা তার কাছে ব্যাখ্যার অতীত মনে হলো।  কমান্ডার মুস্তাফিজ চোখ ফিরিয়ে নিলেন, টেনে আসামীকে ঘর থেকে বের করলেন, এবং অস্ত্র উদ্ধারে গেলেন।
কালের পরিক্রমায় কমান্ডার মুস্তাফিজ নিজেকে লিভিং লিজেন্ড-এ পরিণত করেছেন। দ্রুত পদোন্নতি পেয়েছেন। সাফল্য এনেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিটি মিশন থেকে। বয়স পঁয়তাল্লিশ পেরিয়েছে, এখনও প্রশিক্ষণে খাটেন পশুর মত। আজ তার মতো এতটা দু:সাহসী, এতটা কষ্টসহিষ্ণু অফিসার পুরো বাহিনীতে আরেকজন নেই। অস্ত্র উদ্ধারে তার  অভিযানের সংখ্যা বিস্ময়ের উদ্রেক করে। কমান্ডার মুস্তাফিজ একজন উদাহরণ এখন।
মুস্তাফিজ বিয়ে করেননি। সন্তান কোনোদিন তার চোখে চোখ রাখবে, এটা তিনি হতে দিতে চাননি।